আট মাসে বিটকয়েনের বাজারমূল্য কমেছে ১.২ ট্রিলিয়ন ডলার

ক্রিপ্টোকারেন্সির শীর্ষ টোকেন বিটকয়েনের বাজার থেকে গত আট মাসে ১ লাখ ২০ হাজার কোটি বা ১ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ মূল্য হারিয়ে গেছে।

গত বছরের শেষ দিকে যেখানে একটি বিটকয়েনের দাম রেকর্ড ১ লাখ ২৬ হাজার ডলারে উঠেছিল, ক্রমাগত বিক্রির চাপে তা এখন নেমে এসেছে ৬০ হাজার ডলারের ঘরে। খবর সিএনএন।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০২৫ সালের নভেম্বরের নির্বাচনে জয়ী হয়ে দ্বিতীয়বারের মতো ক্ষমতায় আসেন। তিনি ক্রিপ্টোকারেন্সি বা ডিজিটাল মুদ্রার প্রতি ইতিবাচক মনোভাব দেখাবেন এমন একটি ধারণা ছিল বাজারে। এ কারণে নির্বাচনের পর পরই বিটকয়েনের দাম হু হু করে বাড়তে থাকে। নির্বাচনের মাত্র এক মাসের মাথায় ক্রিপ্টোকারেন্সিটির দাম ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ১ লাখ ডলারের রেকর্ড সীমা পার হয়ে যায়।

কিন্তু আট মাস ধরে বিটকয়েনের বাজারে ক্রমাগত মন্দা ও দরপতন চলছে। বিনিয়োগকারীরা ব্যাপক হারে বিটকয়েন বিক্রি করে দেয়াতে এর দাম কমতে কমতে গত শুক্রবার এমন একপর্যায়ে নেমে গেছে, যা ২০২৪ সালের নির্বাচনের ঠিক আগের দামের চেয়েও কম। বিপরীতে আমেরিকার মূল শেয়ার বাজার এসঅ্যান্ডপি ৫০০ চলতি বছর প্রায় ১০ শতাংশ এবং ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদ শুরুর পর থেকে ৩০ শতাংশ বেড়েছে।

পতনের নেপথ্যে যেসব কারণ

বিশ্লেষকদের মতে, বেশ কয়েকটি কারণে বিটকয়েনের বাজারে মন্দা চলছে। এর মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই একটি। সাম্প্রতিক সময়ে বিনিয়োগকারীদের সব আগ্রহ কেড়ে নিয়েছে এআই প্রযুক্তি। ইলোন মাস্কের স্পেসএক্সের মতো মেগা আইপিও ও এআই খাতের নতুন উন্মাদনার কারণে ক্রিপ্টো বাজার থেকে চোখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন বিনিয়োগকারীরা। ফোরসাইড ইনভেস্টরসের প্রধান নির্বাহী জোনাথন বিয়ার জানান, বাজারের অনেক অর্থ এখন বিটকয়েন থেকে সরে এআই খাতে চলে যাচ্ছে।

পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যস্ফীতি ও ফেডারেল রিজার্ভের সুদহার নিয়ে বাজারে অনিশ্চয়তা রয়েছে। উচ্চ সুদহারের আশঙ্কায় অনেক ব্যবসায়ী ক্রিপ্টোকারেন্সি থেকে বিনিয়োগ তুলে নিচ্ছেন। সাধারণত বাজারে নগদ অর্থের প্রবাহ বেশি থাকলে ও সুদহার কম থাকলে ক্রিপ্টো ভালো ব্যবসা করে।

বিটকয়েনের অন্যতম বড় করপোরেট বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান স্ট্র্যাটেজি সম্প্রতি ৩২টি বিটকয়েন বিক্রি করেছে। ২০২২ সালের পর যা কোম্পানির প্রথম বিক্রি। এ খবর ছড়াতেই বাজারে আতঙ্ক তৈরি হয় এবং এক সপ্তাহে বিটকয়েনের দাম ১৭ শতাংশ পড়ে যায়।

শার্ক ট্যাংক তারকা ও উদ্যোক্তা মার্ক কিউবান বলেন, ‘আমার মনে হয় বিটকয়েন মূল লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হয়েছে। অনিশ্চয়তার সময় এটি যে সুরক্ষা দেবে ভেবেছিলাম, তা দিতে পারেনি।’

বিশ্ব অর্থনীতিতে ক্রিপ্টোকারেন্সির গুরুত্ব

বিটকয়েনের বর্তমান ধস সত্ত্বেও বিশ্ব অর্থনীতিতে ক্রিপ্টোকারেন্সি ও ব্লকচেইন প্রযুক্তির গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে। এটি এখন আর কেবল ব্যক্তিগত বিনিয়োগের মাধ্যম নয়, বরং বিশ্ব আর্থিক ব্যবস্থার একটি বড় অংশ হয়ে উঠেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, সনাতন ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে গিয়ে আন্তর্জাতিক লেনদেন সহজ ও দ্রুত করতে ক্রিপ্টো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বিশেষ করে যেসব দেশে শক্তিশালী ব্যাংকিং সেবা নেই, সেখানে ক্রিপ্টোকারেন্সি আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়াচ্ছে। এছাড়া বিশ্বের বড় বড় হেজ ফান্ড, সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান (যেমন ব্ল্যাকরক) এখন ক্রিপ্টোকে পোর্টফোলিওতে জায়গা দিচ্ছে। ফলে এটি মূলধারার অর্থবাজারের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত হয়ে পড়েছে। ইথেরিয়ামের মতো ক্রিপ্টোকারেন্সিগুলো ‘ডিসেন্ট্রালাইজড ফাইন্যান্স’ বা ডিফাইয়ের ভিত্তি তৈরি করেছে। এর মাধ্যমে মধ্যস্থতাকারী বা ব্যাংক ছাড়াই ঋণ নেয়া, বীমা বা চুক্তি সম্পাদন করা সম্ভব হচ্ছে, যা বৈশ্বিক বাণিজ্যকে আরো গতিশীল করছে। পাশাপাশি ডলারের মূল্যের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ ‘স্ট্যাবলকয়েন’গুলো এখন বিশ্বজুড়ে দ্রুত ও কম খরচে রেমিট্যান্স পাঠানোর অন্যতম প্রধান মাধ্যম হিসেবে জনপ্রিয় হচ্ছে।

সামনের দিনগুলোয় কী অপেক্ষা করছে?

বিটকয়েনের জনপ্রিয়তা কমলেও ‘হাইপ’-এর মতো কিছু নতুন কয়েন চলতি বছরে ১৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। তবে এ খাতের সবচেয়ে বড় আশার আলো হতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যাপিটাল হিলে বর্তমানে চলমান ‘ক্ল্যারিটি অ্যাক্ট’-সংক্রান্ত বিতর্ক। আইনটি পাস হলে ক্রিপ্টো বাজারের জন্য সুনির্দিষ্ট আইনি ও নিয়ন্ত্রণমূলক নীতিমালা তৈরি হবে, যা পুরো শিল্পকে বৈধতা দেবে।

আরও